✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৫, | ০১:৪৪:৪১ |তুরস্কের ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার। বিশ্বের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম আচ্ছাদিত বাজারগুলোর অন্যতম এই বিপণিকেন্দ্র শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন কারুশিল্প, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান হস্তান্তরের এক অনন্য জগৎ।
প্রায় ৫০০ বছর ধরে এই বাজারকে প্রাণবন্ত রেখেছে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের কারিগরদের মধ্যে গড়ে ওঠা সহযোগিতা, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও ঐতিহ্যের বন্ধন।
৭৮ বছর বয়সী উমিত বের্কসয়ের হাতের ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নিচে তখন ঝলমল করছে একটি বড় চুনি পাথর। ইস্তাম্বুলের এই কিংবদন্তিতুল্য বাজারের অভিজ্ঞ গয়না ব্যবসায়ী পাথরটি পরীক্ষা করতে করতে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এটি তার সিন্দুকে রাখা ছিল। এত বড় ও নিখুঁত চুনি এখন আর সহজে পাওয়া যায় না, যা একটি আংটির জন্য একেবারে উপযুক্ত।
এই চুনিকে ঘিরেই শুরু হয় নতুন এক কারুশিল্পের যাত্রা। বাজারের সরু গলি, ঐতিহাসিক ভবন আর ছোট ছোট কর্মশালার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেন বের্কসয়। তার কাছে গ্র্যান্ড বাজারের প্রকৃত সৌন্দর্য এর ঝলমলে দোকান কিংবা পর্যটকদের ভিড়ে নয়, বরং আড়ালে থাকা দক্ষ কারিগরদের কাজে।
সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদের হাত ধরে যাত্রা
১৪৫৩ সালে বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে কনস্টান্টিনোপল দখলের পর উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ গ্র্যান্ড বাজার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। নিজের প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলোর অর্থায়ন এবং বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে তিনি একটি বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাজারটি বিস্তৃত হয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ধাক্কাও সামলে এটি তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উসমানীয় শিল্পকলার ইতিহাসবিদ মুস্তাফা জেজারের বর্ণনা অনুযায়ী, বাজারটির আঁকাবাঁকা গলিগুলো একসময় সামরিক ব্যারাকের মতো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পেশা ও কারুশিল্পের ভিত্তিতে গলিগুলোর পরিচিতি তৈরি হয়।
বর্তমানে ৬৫টি সড়ক, ১৪টি ঐতিহ্যবাহী সরাইখানা এবং প্রায় ৩ হাজার ৬০০ দোকান নিয়ে বিস্তৃত এই বাজারের ১১টি প্রধান প্রবেশপথ রয়েছে। প্রতিদিন এখানে সর্বোচ্চ চার লাখ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। তবে এই বিপুল আয়োজনের আড়ালেই রয়েছে বাজারটির প্রকৃত প্রাণ- ছোট ছোট কারখানা ও কর্মশালা।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কারিগরদের বন্ধন
গ্র্যান্ড বাজারের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তুরস্কের আর্মেনীয়, গ্রিক, ইহুদি ও সিরীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কারিগরদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। তারা দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি কাজ করেছেন, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়েছেন এবং নিজেদের দক্ষতা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়েছেন।
বের্কসয় জানান, বাজারের মোটা দেয়ালের আড়ালে এই কারুশিল্পের ঐতিহ্য টিকে রয়েছে, যদিও সময়ের সঙ্গে দোকানের পণ্য ও সাজসজ্জায় পরিবর্তন এসেছে। বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা এবং নতুন ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন।
বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চেভাহির বেদেসতেনি। ১৫টি গম্বুজবিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বাজারের বিস্তার ঘটেছে। অর্থনীতির অধ্যাপক কেনান মরতানের উদ্ধৃত একটি প্রাচীন বাণী সেখানে ব্যবসার দর্শন তুলে ধরে- মুনাফা বুনো পাখির মতো, যা বাতাসে উড়ে বেড়ায়; কৌশলে তাকে ধরতে পারলেই সমৃদ্ধি আসে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গয়না তৈরির ঐতিহ্য
বাজারের ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত আর্মেনীয় মালিকানাধীন ‘আপারাম’ দোকানে কাঁচা স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু বিক্রি হয়। কাছেই ‘এপোক’ নামের একটি প্রাচীন সামগ্রীর দোকান, যার ব্যবসার ইতিহাস ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। ৭৬ বছর বয়সী গেভার্ট তেমিনিয়ান কৈশোরে সেখানে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। এখন তিনি তার সাবেক শিক্ষানবিশ ইব্রাহিম হালিল ইয়িসারাচের সঙ্গে ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন।
তেমিনিয়ান জানান, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে অনেকেই মূল্যবান সামগ্রী বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে আসছেন। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে, গয়না তৈরির কারিগর সেভান হারুনিয়ান প্রায় ৪৬ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। তার কর্মশালায় বের্কসয়ের নকশা অনুযায়ী ১২ ক্যারেটের চুনিটি স্বর্ণের আংটিতে বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
সেভানের দুই ছেলে আরদা ও আরাস ছোটবেলা থেকেই বাবার কর্মশালায় কাজ শিখেছেন। ইস্তাম্বুলের মিমার সিনান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিষয়ে পড়াশোনা করা আরাস পারিবারিক ব্যবসায় কম্পিউটারভিত্তিক নকশা তৈরির প্রযুক্তি যুক্ত করেছেন। তার ভাই আরদা হাতে-কলমে কাজ শিখছেন।
সেভানের মতে, এই পেশা এবং গুরু-শিষ্যভিত্তিক শিক্ষার ধারাকে টিকিয়ে রাখা জরুরি। কারণ, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করা গেলেই এই ঐতিহ্যের প্রকৃত মূল্য বজায় থাকবে।
হাতে তৈরি গয়নার কদর এখনও অটুট
গ্র্যান্ড বাজারে গয়না এখনও সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক খাত। ২০১৭ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাজারের ভেতরে ৫৩২টি গয়নার দোকান, স্বর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সেবা দিতে ৫৭ জন দক্ষ কারিগর কাজ করতেন।
এমনই একজন ৬৬ বছর বয়সী হ্রান্ত জোরবাস। পাথর বসানোর কাজে বিশেষজ্ঞ এই কারিগর বের্কসয়ের নকশা অনুযায়ী সেভানের তৈরি আংটিতে চুনিটি বসানোর দায়িত্ব নেন। তার ছেলে শান্ট আধুনিক জুয়েলার্স মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করলেও জোরবাস এখনও নিজের চোখে পাথরের ফাটল, ত্রুটি ও বসানোর সূক্ষ্ম চিহ্ন পরীক্ষা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
শান্টের মতে, মানুষের জীবনযাপন ও বিলাসপণ্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ায় গয়নার ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। তবু হাতে তৈরি গয়নার মূল্য বোঝেন- এমন ক্রেতা এখনও রয়েছেন।
আংটিতে নিখুঁতভাবে বসানো চুনিটি দেখে মুগ্ধ বের্কসয় বলেন, কারখানায় তৈরি কোনও আংটি কি এই সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে?
তার এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে গ্র্যান্ড বাজারের টিকে থাকার রহস্য। আধুনিক বিপণিকেন্দ্রের বিস্তার সত্ত্বেও পারস্পরিক বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, দক্ষতা এবং প্রজন্মান্তরে কারুশিল্প হস্তান্তরের ঐতিহ্যই প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে এই বাজারকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সূত্র: সিএনএন