✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৯-২৯, | ০১:৪০:০৪ |ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে বন্দী হওয়া দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় হস্তান্তরের পর তাদের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় ধরা পড়া এই দুই সেনাকে কেন্দ্র করে তাদের নিরাপত্তা, আইনি ভিত্তি, জিজ্ঞাসাবাদ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া নিয়ে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছানোর পর এই দুই সেনাকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এই দুই সেনার সুরক্ষা এবং স্থায়ী পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের বিস্তৃত জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তাজনিত যাচাইবাছাই করবে। রাজধানী সিউলের একীকরণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট আইন এবং অতীতে অনুসরণ করা নজিরগুলোর আলোকেই তাদের মামলা পর্যালোচনা করা হবে। এর অর্থ হলো, সেখানে ‘উত্তর কোরীয় স্থানচ্যুত ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন সহায়তা আইন’ প্রযোজ্য হতে চলেছে। নিয়ম অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক হেফাজতে থাকা আবেদনকারীদের পরিচয়, উত্তর কোরিয়া ত্যাগের কারণ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে তদন্ত করে দেখে। এই তদন্ত ও সাময়িক সুরক্ষার মেয়াদ ৯০ দিন পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রয়োজনে বিশেষ পরিস্থিতিতে আরও বাড়ানো সম্ভব।
এই সেনা দুইজনের বিশেষ সামরিক পটভূমি এবং রাশিয়ায় উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েনের বিষয়ে তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকায়, দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তাদের কাছ থেকে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য বের করতে দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। যারা শেষ পর্যন্ত সুরক্ষা বা আশ্রয়ের অনুমতি পান, তারা মূলত দক্ষিণ কোরীয় সমাজে মিশে যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরোধীদলীয় আইনপ্রণেতা ইউ ইয়ং-ওয়েন, যিনি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে গিয়ে সরাসরি এই দুই সেনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তিনি জানিয়েছেন যে তারা উত্তর কোরিয়ার বিশেষ বাহিনীর সদস্য ছিলেন। ফলে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সক্ষমতা, তাদের দেওয়া প্রশিক্ষণ এবং ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের ধরন সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সামরিক তথ্য তারা সিউলের কাছে সরবরাহ করতে পারবেন।
কাদের সুরক্ষা দেওয়া হবে সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণত দক্ষিণ কোরিয়ার একীকরণ মন্ত্রীই নিয়ে থাকেন, তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এনআইএস প্রধানও এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন। আইনপ্রণেতা ইউ রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই বিষয়ের স্পর্শকাতরতার কারণে হয়তো সাধারণ উত্তর কোরীয় আশ্রয়প্রার্থীদের তুলনায় এই দুই সেনাকে আরও বেশি দিন জনসম্মুখের বাইরে রাখা হতে পারে। পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পরীক্ষাও করা হবে। কারণ ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবিরে তাদের আলাদাভাবে দীর্ঘ সময় ধরে রাখা হয়েছিল, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন উঠেছে, যুদ্ধবন্দী হিসেবে তাদের হস্তান্তর করার পূর্ণ অধিকার ইউক্রেনের ছিল কি না। তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন অনুসারে, যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পরপরই যুদ্ধবন্দীদের কোনো বিলম্ব ছাড়া মুক্তি দেওয়া ও নিজ দেশে ফেরত পাঠানো বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এটি যুদ্ধের মাঝপথে কোনো যুদ্ধবন্দীকে মুক্তি দেওয়া বা অন্য কোনো তৃতীয় দেশে স্থানান্তর করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় না। সিউল ও কিয়েভ এখন পর্যন্ত তাদের এই স্থানান্তরের সঠিক আইনি ভিত্তি বা এর ফলে তাদের যুদ্ধবন্দী মর্যাদার বিলুপ্তি ঘটেছে কি না, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। সেজং ইনস্টিটিউটের গবেষক পিটার ওয়ার্ড উল্লেখ করেছেন যে, যুদ্ধবন্দীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো একটি সাধারণ নিয়ম হলেও, যেখানে ফেরত পাঠালে তাদের জীবন, অধিকার বা নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে, সেখানে এই নীতি প্রযোজ্য নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি নিজের পছন্দের দেশে স্থানান্তরিত হতে চান এবং সেই দেশ যদি তাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে, তবে তাদের হস্তান্তরের যথেষ্ট আইনি ও মানবিক ভিত্তি রয়েছে।
তবে কোরিয়া বিশ্ববদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং উত্তর কোরিয়ার মানবাধিকার বিষয়ক সাবেক বিশেষ দূত লি শিন-হোয়া মনে করেন, এই স্থানান্তর থেকে কূটনৈতিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে উত্তর কোরিয়া একটি স্বাধীন ও পৃথক রাষ্ট্র হলেও দক্ষিণ কোরিয়ার সংবিধানে সমস্ত উত্তর কোরীয় নাগরিককে মূলত দক্ষিণ কোরিয়ারই নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু সেনাদ্বয়ের নিজ মুখে দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ এবং উত্তর কোরিয়ায় ফিরলে তাদের ওপর নেমে আসা চরম ঝুঁকির বিষয়টি তাদেরকে গ্রহণ করার পক্ষে শক্ত মানবিক যুক্তি তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অন্যতম ভিত্তি হলো ‘নন-রিফলমেন্ট’ নীতি, যা স্পষ্ট করে বলে যে কাউকে এমন কোনো দেশে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তিনি নির্যাতন, নিপীড়ন বা মারাত্মক ক্ষতির শিকার হতে পারেন। ফলে এদের কোনোভাবেই উত্তর কোরিয়ায় ফেরত পাঠানোর সুযোগ ছিল না। লি শিন-হোয়া বলেন, যুদ্ধবন্দীদের নিজ দেশে পাঠানো সাধারণ নিয়ম হলেও আন্তর্জাতিক চর্চায় স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন এবং সম্ভাব্য নির্যাতনের ঝুঁকি থাকলে ফেরত না পাঠানোর নীতি স্বীকৃত। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ইতিমধ্যেই ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে আত্মহত্যা করা সেনাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় আত্মসমর্পণ বা বন্দী হওয়া সেনাদের জন্য পিয়ংইয়ংয়ের অবস্থান কতটা কঠোর। ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলে বন্দী হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাত্কার এবং আইনপ্রণেতা ইউ-এর সাথে আলোচনার সময় তারা বারবার দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ফলে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে উত্তর কোরিয়ার এদের ফেরত চাওয়ারও কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ কোরিয়ার নীতিগত অবস্থান এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যতম শীর্ষ অস্ত্র প্রস্তুতকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমা দেশগুলো ও ইউক্রেনের প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহের চাপ সিউল এড়িয়ে গেছে। তারা মূলত মাইন অপসারণ সরঞ্জাম সহ অ-মারাত্মক সাহায্য ও মানবিক সহায়তার ওপর জোর দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রনেতা লি জে মাইয়ং ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেনের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও তার সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে এই সহায়তায় কোনো মারণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত নয়। জুলাইয়ের এক সম্মেলনে দক্ষিণ কোরীয় প্রেসিডেন্ট এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্মত হন যে, উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীদের বিষয়টি তাদের নিজস্ব স্বাধীন ইচ্ছা, আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবিক মূলনীতি বজায় রেখেই সমাধান করা হবে।
সূত্র: রয়টার্স