✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-০৮-২৭, | ১৪:৫৬:৩০ |এক বিশাল জলস্রোত, কাদা ও পাথরের প্রাচীর যখন গর্জন করে ধেয়ে আসছিল, নেপালি শ্রমিক বিবেক কুমাল তখন একটি সদ্য নির্মিত বাড়ির বাইরে শৌচাগারের গর্ত খুঁড়ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ধ্বংসাত্মক ঢল তাঁকে এবং আশেপাশের সবকিছুকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু অলৌকিকভাবে একটি আমগাছে আটকে গিয়ে এযাত্রায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী এই যুবক।
বুধবার চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালের রসিকোয়া জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ভাটিতে অবস্থিত বিদুরে কাজ করছিলেন কুমাল। হঠাৎ করেই তিনি একটি ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনতে পান। প্রায় পাঁচ ফুট গভীর গর্তের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর চারজন সহকর্মী তাঁকে চিৎকার করে উঠে দ্রুত পালিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু তিনি যখন গর্ত থেকে উঠে আসার পথ খুঁজছিলেন, ততক্ষণে তাঁর সহকর্মীরা সেখান থেকে সটান সটান পালিয়ে গেছেন।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কুমাল জানান, তিনি দৌড়াতে শুরু করতেই যেন ভূমিকম্পের মতো শব্দে এক বিশাল পানির দেয়াল ধেয়ে আসে। সেই জলের তোড়ে মাটি ও ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে তিনি ভাটির দিকে ভেসে যেতে থাকেন। তবে ভাগ্যের জোরে তিনি একটি আমগাছে আটকে যান। তিনি স্পষ্ট স্বীকার করেন যে, সেদিন যদি সেই আমগাছটি সেখানে না থাকত, তবে ভেসে গিয়ে নিশ্চিতভাবেই তাঁর মৃত্যু হতো। গাছে আটকে থাকার সময়ই তিনি নিজের চোখে দেখেন যে বাড়িতে তিনি কাজ করছিলেন সেটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে গেছে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে। পানির আঘাত এবং একটি বড় পাথরের চোট লেগে তাঁর ডান পা জখম হলেও অন্য এলাকায় থাকা তাঁর নিজের বাড়িটি ভাগ্যক্রমে অক্ষত রয়েছে।
এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ইতিমধ্যেই অন্তত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বহু বিদেশি পর্যটকসহ আরও শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের তিব্বত সীমান্তে ধস নেমে একটি নদীতে কাদা ও পাথর পতনের পর সৃষ্ট এই বন্যা ভাটির বহু জনপদ ও অবকাঠামো এক লহমায় ধ্বংস করে দেয়। জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা ফুটেজে দৃশ্যমান সময়সূচীর ঠিক সাত মিনিট আগে এলাকায় ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, যা এই ভূমিধসের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে কাঠমান্ডুর ন্যাশনাল ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন কুমালের পাশে রয়েছেন তাঁর ভাই দিনেশ। কুমালের পাশাপাশি আরও কয়েকজন আহতকে উদ্ধার করে রাজধানী কাঠমান্ডুতে নিয়ে আসা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১১৪ জনেরও বেশি মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং কাঠমান্ডু ও রসিকুয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে তাঁদের চিকিৎসা চলছে।
অত্যন্ত পাহাড়ি দেশ নেপালে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধস নিত্যদিনের ঘটনা। এর আগে কিশোর বয়সেও কুমাল ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের সাক্ষী হয়েছিলেন, যেখানে প্রায় ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
আমগাছে বেঁচে যাওয়া কুমালের ঠিক সামনের বিছানায় চিকিৎসাধীন ১১ বছর বয়সী রীহানা লামিছানে। সেই ভয়াবহ মুহূর্তে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে আক্রান্ত হয় ছোট মেয়েটি। সে জানায়, পরিস্থিতির কারণে তাঁদের স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে সবাইকে বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু নদী পার হওয়ার সময় হঠাৎ করেই বন্যার পানি প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসে। বুকে ও পায়ে আঘাত পেলেও মেয়েটি বেঁচে থাকার আনন্দে উৎফুল্ল, যদিও তার সাথে থাকা বন্ধুদের কী পরিণতি হয়েছে তা সে জানে না। রীহানার মা রীতা খবর পেয়ে দৌড়ে এসে মেয়েকে অক্ষত অবস্থায় পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে জানান, মেয়ের মারাত্মক কিছু না হওয়ায় তিনি অন্তরের গভীর থেকে কৃতজ্ঞ।
সূত্র: রয়টার্স