মানবিক অনুভূতি আর উপস্থিত বুদ্ধির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৬৫ বছর বয়সি এক দিনমজুর। ভাঙা রেললাইন দেখে লাল কাপড়ের বদলে কলার মোচা উঁচিয়ে সংকেত দিয়ে থামিয়ে দিয়েছেন চলন্ত ট্রেন। তার এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে একটি আন্তনগর ট্রেন, বেঁচে গেছে শতশত যাত্রীর প্রাণ।
সোমবার (২৩ মার্চ) ঈদের তৃতীয় দিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরামপুর রেলওয়ের মধ্যবর্তী পূর্ব চণ্ডীপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেয়া ওই দিনমজুরের নাম এনামুল হক। তিনি পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামের মৃত ফজলুল হক সোনারের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন এনামুল হক। এমন সময় তার চোখে পড়ে লাইনের প্রায় এক ফুট অংশ ভাঙা। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজনকে ডেকে রেলওয়ে অফিসে খবর দিতে বলেন। আর নিজে ট্রেন থামানোর সংকেত দেয়ার জন্য লাল রঙের কাপড় খুঁজতে থাকেন।
হাতে সময় কম থাকায় কোনো কিছু না পেয়ে তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে পাশের একটি বাগান থেকে কলার মোচা ছিঁড়ে নেন তিনি। এরপর সেটির লাল রঙের পাপড়ি লাঠির আগায় বেঁধে রেললাইনে দাঁড়িয়ে যান। মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী আন্তনগর ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ কাছাকাছি চলে আসে। কিন্তু এনামুলের হাতে লাল সংকেত দেখে চালক নিরাপদ দূরত্বেই ট্রেনটি থামিয়ে দেন। এতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে যান ট্রেনের যাত্রীরা।
এনামুল হকের ডাকে সাড়া দিয়ে শাহিনুর নামে স্থানীয় এক যুবক পার্বতীপুর রেলওয়ে অফিসে খবর দেন। শাহিনুর বলেন, ‘প্রতিবেশী এনামুল হক আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বিষয়টি জানান। আমি দ্রুত পরিচিত এক রেল কর্মকর্তাকে ফোন করে ঘটনাটি খুলে বলি। পরে রেলওয়ের লোকজন এসে বিকল্প ব্যবস্থায় আটকে থাকা ট্রেনটি পার করে দেন।’
খবর পেয়ে আধা ঘণ্টা পর রেলওয়ের প্রকৌশলী দল ও শ্রমিকেরা এসে লাইন মেরামত করেন। বর্তমানে ওই লাইনে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। ওই পথে প্রতিদিন ঢাকা, রাজশাহী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, পার্বতীপুর, চিলাহাটিসহ উত্তরাঞ্চলের ১০ থেকে ১৫টি ট্রেন যাতায়াত করে।
এমন মহৎ কাজের পর পূর্ব চণ্ডীপুর গ্রামে এনামুল হকের বাড়িতে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার পরপরই তিনি নিজের কাজের সন্ধানে ফরিদপুরের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছেন।
ফুলবাড়ী স্টেশনমাস্টার শওকত আলী জানান, সকাল সাড়ে ৬টায় ফুলবাড়ী-বিরামপুর রেলওয়ের মধ্যবর্তী ৩৫২/৫ থেকে ৩৫২/৬ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি স্থানে লাইন ভেঙে যাওয়ার খবর পান তারা। দ্রুত প্রকৌশলী দল গিয়ে লাইন মেরামত করে।
তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় আধা ঘণ্টার বেশি সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এলাকাবাসীর সচেতনতার কারণেই আজ একটি ট্রেন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং অনেক প্রাণ বেঁচে গেছে।
সম্প্রতি এই একই রেলপথের সান্তাহার এলাকায় ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এতে ঈদে ঘরমুখী মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন।
এ জাতীয় আরো খবর..