শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করা এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এখন বিপাকে পড়েছে। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট পাল্টা শুল্কের পদক্ষেপ বাতিল করায় এসব চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। চুক্তিতে অত্যধিক ছাড়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় কোনো কোনো দেশের সরকারপ্রধানরা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপের মুখে পড়েছেন।
বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনও বাড়তি আইনি চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে। গত এক বছরে শুল্ক বাবদ আদায় হওয়া অর্থ ফেরত পেতে এরই মধ্যে আইনি লড়াই শুরু করেছে এক হাজারের বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে, আদালতের রায়ের পর অনেক অংশীদার দেশ তাদের দেওয়া চুক্তির প্রতিশ্রুতি পুনর্বিবেচনার চেষ্টা করছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাহী ক্ষমতাবলে নতুন করে প্রায় সব পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। সব মিলিয়ে শুল্ক ঘিরে আরেক দফায় অস্থিরতার মুখে পড়তে যাচ্ছে বিশ্ব।
এই অস্থিরতার অন্যতম ভুক্তভোগী হতে পারে এশিয়ার দেশগুলো। কারণ, বিশ্বের অধিকাংশ পণ্য এই মহাদেশে তৈরি হয়। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, পাল্টা শুল্ক আরোপের পর এ অঞ্চলের দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য অনেকটা প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোর ওপর থেকে শুল্ক কমানো। এর অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি দেশ চুক্তি করার সময় বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা এখন নিজ দেশে রাজনৈতিক তিরস্কারের মুখে পড়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অনেক বেশি ছাড় দেওয়া, এমনকি জাতীয় সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দেওয়ার অভিযোগও তোলা হচ্ছে।
পাল্টা শুল্কের খড়্গ মাথায় নিয়ে জাপান, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নিজেদের শুল্ক তুলে নেওয়ার মতো কঠিন ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো দেশ ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ সংগ্রহের বিষয়ে একাত্ম হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতকে যেমন ক্ষুব্ধ করেছে, তেমনি চীনের মতো বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও বিরাগভাজন করেছে।
চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্য আলোচনার মূল ভিত্তি ছিল ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ)’-এর মাধ্যমে আরোপ করা শুল্ক। গত শুক্রবার মার্কিন আদালত ট্রাম্পের এই আইন প্রয়োগের বৈধতা বাতিল করেছেন। এরপর চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, অনেকগুলো চুক্তি বহাল থাকবে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেছেন, কিছু চুক্তি নাও টিকতে পারে। সেগুলোর বদলে অন্য শুল্ক আরোপ করা হবে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির চেয়ারম্যান জশ লিপস্কি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, যেসব দেশ ইতোমধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করেছে, তারা তা বজায় রাখতে পারে। কারণ, এই সমঝোতা কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। ফলে অনেকেই এটি নষ্টের ঝুঁকি নিতে চাইবে না। কেবল যেসব দেশের চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে, তারা এখন আলোচনার টেবিলে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়েন্ডি কাটলার মনে করেন, ঘোষিত চুক্তিগুলো থেকে অংশীদাররা সরে যাবে না। তারা খুব ভালো করেই জানে, এমন পদক্ষেপের ফলে শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক আরও বিরূপ হবে।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালতের রায়ের পর এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া বাণিজ্যচুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছে। রায়কে স্বাগত জানিয়েছে কানাডা, মেক্সিকো, ফ্রান্স ও জার্মানি।
‘একই পর্যায়ের শুল্ক ফেরানো হবে’
আর্থিক পরিষেবার সংস্থা আইএনজি বলছে, আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ট্রাম্প শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম হাতিয়ারটি হারিয়েছেন।
বিষয়টি মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের সাক্ষাৎকারেও ফুটে উঠেছে। গত শুক্রবার ফক্স নিউজকে বেসেন্ট বলেন, আইইইপিএর ওপর ভিত্তি করে আরোপিত শুল্কগুলো ছিল অন্যান্য দেশের ওপর প্রভাব খাটানোর বিশেষ অস্ত্র। এর মাধ্যমে দেশগুলোকে অল্প সময়ের মধ্যে আলোচনার টেবিলে বসানো সম্ভব হয়েছিল।
স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা দেশগুলোর জন্য পুনরায় একই পর্যায়ের শুল্ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনব। তবে এটি এখন কিছুটা পরোক্ষ ও কিছুটা জটিল উপায়ে করা হবে।’
সামনে আরও অস্থিরতা
আদালতের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প বিকল্প ক্ষমতার আওতায় আমদানির ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন (পরে আরও ৫ শতাংশ বাড়িয়েছেন)। এই পদক্ষেপ সাময়িক। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যতে আরও স্থায়ী শুল্ক আরোপের পথ তৈরি করে রাখলেন। যা নতুন করে অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই শুল্ক আরোপের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ধারা ১২২-এর প্রয়োগ করেছেন। এর আওতায় শুল্ক আরোপের মেয়াদ থাকে ১৫০ দিন। এরপর কংগ্রেস সময়সীমা না বাড়ালে শুল্কটি বাতিল হয়ে যায়। তবে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ধারা ৩০১-এর অধীনে অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলনের বিষয়ে নতুন তদন্ত করবেন। এই আইনি লড়াইয়ের কারণে নতুন আরোপিত শুল্ক দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা আছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জশ লিপস্কি এএফপিকে বলেছেন, আদালতের রায় ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে কেবল একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ব্যবসায়ীদের জন্য সামনে আরও অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি হবে। বিভিন্ন দেশের জন্য বাণিজ্যচুক্তির আলোচনাও কঠিন হতে পারে।
অর্থ ফেরতের দীর্ঘ পথ
আদালতের রায়ের ফলে শুল্কের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের সূত্রপাত হলো। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বৈশ্বিক শুল্ক বাবদ ১৩৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার সংগ্রহ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এই অর্থ ফেরতের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। বিশ্লেষকদের মতে, আগামী মাসগুলোতে নিম্ন আদালতে এ বিষয়ের ফয়সালা হতে পারে।
আর্থিক পরিষেবার সংস্থা আইএনজির বিশ্লেষক কার্স্টেন ব্রজেস্কি এবং জুলিয়ান গেইব বলছেন, ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন ‘কোর্ট অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করবেন। অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটবে না। যে আমদানিকারক অর্থ ফেরত চাইবেন, তাকে পৃথকভাবে মামলা করতে হবে।
অর্থ ফেরত চাওয়ার প্রক্রিয়াটি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক হাজারের বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠান আইনি লড়াই শুরু করেছে। তবে শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা সম্ভবত আগামী পাঁচ বছর আদালতপাড়াতেই পড়ে থাকব।’ যা থেকে বোঝা যায়, অর্থ ফেরত পাওয়ার পথ খুব সহজ হবে না।
এ জাতীয় আরো খবর..